বর্তমান সময়:0:00পুরো সময়কাল:3:56
0 শক্তি পয়েন্ট
ভিডিও ট্রান্সক্রিপ্ট
আমরা আছি বৃটিশ মিউজিয়ামে আর আমাদের সামনে রয়েছে এখানকার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সংগ্রহ, রজেটো স্টোন। প্রতিদিন বহু মানুষ গ্লাসের বাক্সের মধ্যে রাখা এই ঐতিহাসিক পাথরটির ছবি তোলে। সবার মধ্যে এটি জনপ্রিয়। মিউজিয়ামের দোকানে রজেটো স্টোনের বিভিন্ন স্যুভেনির আছে। সেখানে ছোট রজেটো স্টোন, রজেটো স্টোনের ছবি এবং ছবিসহ মগ পাওয়া যায়। এখানে রজেটো স্টোনের মাদুরও পাওয়া যায়। এই বিশেষ পাথরটি ঐতিহাসিকভাবে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এই স্টোনের মাধ্যমেই আমরা প্রথমবারের মত হায়রোরোগ্লিফিক্স ভাষাটিকে বুঝতে,পড়তে এবং অনুবাদ করতে সক্ষম হয়েছি । হায়রোরোগ্লিফিক্স ছিল প্রাচীন মিশরীয়দের লেখার ভাষা। প্রায় উনবিংশ শতাব্দীর মাঝঅব্দি হায়রোগ্লিফিক্সের অর্থ উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। হায়রোগ্লিফিক্স ছিল মূলত চিত্র নির্ভর একটি ভাষা। আর এটাই ছিল সমস্ত সমস্যার সূত্রপাত। কারণ প্রাচীন প্রত্নতাত্ত্বিক এবং ভাষাবিদরা মনে করতেন যে তারা যে ছবিটা দেখছেন, (ছবিতে পাখি আর সাপ সহ অনেক রকমের আকৃতি দেখা যাচ্ছে) আসলে ছবি দিয়ে নির্দিষ্ট বস্তুকেই বোঝানো হচ্ছে। মানে যদি পাখির ছবি থাকে তাহলে এখানে হয়তো পাখি নিয়ে কিছু বলা হচ্ছে। কিন্তু ব্যাপারটা আসলে এরকম ছিল না। এটি সেই সময়ের প্রেক্ষিতে উন্নত একটি ভাষা। হায়রোগ্লিফিক্স যে শুধু ছবি নির্ভর ভাষা না তা বুঝতে সাহায্য করে এই রজেটো স্টোন। এগুলো আসলে চিত্র না। এই ভাষা ছিল মূলত ধ্বনিতাত্ত্বিক। আসলে যেগুলো ছবি মনে হয়, সেগুলো মূলত বিভিন্ন ধরনের ধ্বনিকে প্রকাশ করে। এভাবেই ভাষাবিদরা প্রথমবারের মত এই ভাষাটা বুঝেন এবং এই প্রাচীন মিশরীয়দের ভাষাটিকে অনুবাদ করতে সক্ষম হন। অনুবাদ করতে পারার মূলে আছে এই রজেটো স্টোন যেখানে একটি বাক্যকেই তিন বার, তিনটি ভিন্ন ভাষায় লেখা হয়েছে । তো, এই তিনটি ভাষা হলঃ প্রাচীন গ্রীক, যেটা ছিল একদম নিচের দিকে। প্রাচীন গ্রিক ছিল প্রশাসনিক ভাষা অর্থাৎ সরকারি ভাষা। এর কারণ হিসেবে বলা হয়ে থাকে যে, বিখ্যাত বীর আলেকজ্যান্ডার মিশর জয় করেন, এবং তিনি হেলেনিস্টিক যুগে যেসব গ্রীক নিয়ম প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, সেটা প্রাচীন মিশরেও বজায় রাখেন। মনে রাখা দরকার, এখানে খ্রিষ্টপূর্ব ২০০-এর সময়কার কথা বলা হয়েছে। তখন হায়রোগ্লিফিক্সের সময় প্রায় শেষের দিকে ছিল। মানে আর কয়েকশ বছর পর এই ভাষা একেবারে হারিয়ে যায়। অর্থাৎ ৩০০০-বছরের পুরনো ভাষার এখানেই পরিসমাপ্তি ঘটে। এর পরের সময়কার ভাষা হল ডেমোটিক যেটি মূলত “মানুষের ভাষা”। সাধারণ মিশরীয়রা এই ভাষা ব্যবহার করত। আর হায়রোগ্লিফিক্সের অবস্থান ছিল অনেক উপরে। কারণ এই ভাষা ব্যবহৃত হত ধর্মীয় কাজে। আর রজেটো স্টোনের আগে এই হায়রোগ্লিফিক্সের পাঠোদ্ধার করা মানুষের পক্ষে সম্ভব হয়নি। রজেটো স্টোনের লেখার মধ্যে কারতুশ নামের এক প্রকার আয়তাকার অংশ থাকত যেখানে সেই সময়কার মিশরীয় শাসকদের নাম খোদাই করা থাকত। এখানেই আমরা, পঞ্চম টলেমির কথা পেয়েছি। আর তিনটি ভিন্ন ভিন্ন ভাষায় শাসকের নাম চিহ্নিত করতে পারার মাধ্যমে হিয়েরোগ্লিফিক্সের পাঠোদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। কিন্তু কাজটি কঠিন বিধায় সম্পন্ন করতে অনেক সময় লেগেছে। কিন্তু এতক্ষণ বলাই হয়নি যে, রজেটো স্টোন আমরা পেলাম কোথায়! নেপোলিয়নের একদল সৈন্য ছিল মিশরে। সৈন্যে ছাড়াও নেপোলিয়ন তার সঙ্গে আরো কিছু লোক এনেছিলেন। বলা যায় তারা প্রত্নতত্ত্ববিদ ছিলেন। নেপোলিয়নের এই প্রত্নতত্ত্ববিদদের মধ্যেই একজন প্রথম এই পাথরটিকে খুঁজে পান। মূলত এটি একটা কেল্লার ভিত্তিপ্রস্তর হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছিল । এবং এটি অবশ্যই কোন মন্দির বা প্রাচীন মিশরীয় মন্দির স্থাপিত ছিল। সেই সাথে এটা বলে রাখা দরকার যে এটি হয়ত কোন বড় লম্বা পাথরের ফলক বা টেবিলের নিচের অংশ। তাই নেপোলিয়ন ফেরার সময় এটি সঙ্গে করে নিয়ে যান। আরে, দাঁড়াও! আমরা কিন্তু ল্যুভরে না। আমরা এখনো আছি লন্ডনের বিখ্যাত ব্রিটিশ যাদুঘরে। এটি কিভাবে হল, তা ভাবছো তাই না? আসলে, ব্রিটিশরা নেপোলিয়নকে পরাজিত করে এই পাথর নিয়ে আনে। তারও আর বছর এক বা দুই পর, ১৮০১ বা ১৮০২- এর দিকে পাথরটি ব্রিটিশ যাদুঘরে নিয়ে আসা হয় আর তখন থেকে এটি এখানেই আছে। এবং তখন থেকেই এই পাথর জননন্দিত একটি সংগ্রহে পরিণত হয়েছে।